এই পুরো প্রক্রিয়ায় চীনের কূটনৈতিক প্রভাব বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বেইজিং নিজেকে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির পক্ষের শক্তি হিসেবে তুলে ধরছে এবং একই সঙ্গে বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যে নিজেদের অবস্থান আরও দৃঢ় করার সুযোগ নিচ্ছে।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীন যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটও তুলনামূলকভাবে ভালোভাবে মোকাবিলা করেছে। এর পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে দেশটির বিশাল কৌশলগত তেল মজুত, নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তি এবং বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার বৃদ্ধি।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতাকে স্বাগত জানিয়ে বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে বেইজিং সক্রিয় ভূমিকা রাখতে প্রস্তুত।
চীনের মুখপাত্র লিন জিয়ান সরাসরি দাবি করেননি যে, এই চুক্তিতে বেইজিংয়ের কোনও ভূমিকা ছিল। তবে তিনি উল্লেখ করেন, চীন যুদ্ধ বন্ধে ‘নিরলস প্রচেষ্টা’ চালিয়েছে। এপ্রিলে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের দেওয়া চার দফা শান্তি প্রস্তাবের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
ট্রাম্পের প্রশংসা, চীনের কৌশলী অবস্থান
চীনের ভূমিকার প্রশংসা এসেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকেও। ফ্রান্সে জি৭ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সংঘাতে নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়েছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টায় সহায়তা করেছেন।
ট্রাম্প বলেন, চীন ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন অবরোধ ভাঙতে তাদের নৌবাহিনী ব্যবহার করেনি। তিনি মনে করেন, চীনের এই অবস্থান যুদ্ধ সমাধানে ভূমিকা রাখতে পারে।
যুদ্ধ চলাকালে চীন অত্যন্ত সতর্ক কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রেখেছে। একদিকে তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার সমালোচনা করেছে এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ইরানের কাছ থেকে তেল কেনা অব্যাহত রেখেছে। অন্যদিকে, সংঘাতের সব পক্ষের সঙ্গেই যোগাযোগ ধরে রেখেছে।
গত কয়েক মাসে চীনে সফর করেছেন বিভিন্ন দেশের গুরুত্বপূর্ণ নেতারা। এর মধ্যে ছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং সংঘাতে মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের নেতারা।
শান্তি আলোচনায় চীনের ভূমিকা
আলোচনার শুরুতে ইরান চেয়েছিল, চীন শান্তি চুক্তির একটি আনুষ্ঠানিক জামিনদার (গ্যারান্টর) হিসেবে থাকুক। তবে বেইজিং এমন কোনও আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব নিতে আগ্রহ দেখায়নি।
তবে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ফোনালাপে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, “শান্তির ভোর দেখা যাচ্ছে। এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সব পক্ষ তাদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করবে এবং সব ধরনের বাধা দূর করবে।”
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতার পেছনে চীনের সরাসরি ভূমিকা কতটা ছিল, তা স্পষ্ট নয়। তবে বেইজিংয়ের কাছে এই সংঘাত একটি বড় কূটনৈতিক সুযোগ তৈরি করেছে।
যুদ্ধের সময় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতাদের চীন সফর এবং শান্তির পক্ষে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার মাধ্যমে বেইজিং দেখাতে চেয়েছে- তারা শুধু অর্থনৈতিক শক্তি নয়, বরং বৈশ্বিক কূটনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়।
‘সুয়েজ মুহূর্ত’ কি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য?
ইরান যুদ্ধের পর চীনে একটি প্রশ্ন জোরালোভাবে আলোচিত হচ্ছে- এই সংঘাত কি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ব্রিটেনের ১৯৫৬ সালের সুয়েজ সংকটের মতো কোনও মোড় পরিবর্তনের ঘটনা?
সুয়েজ সংকটের পর যুক্তরাজ্যের বৈশ্বিক প্রভাব কমতে শুরু করে এবং যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব রাজনীতির প্রধান শক্তি হিসেবে আরও প্রতিষ্ঠিত হয়।
চীনের ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক সান দেগাং এক নিবন্ধে প্রশ্ন তুলেছেন, “সুয়েজ সংকটের সময় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ওপর যে ছায়া নেমে এসেছিল, হরমুজ প্রণালীতে কি এবার যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটছে?”
তার মতে, শীতল যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। কিন্তু ইরান যুদ্ধ দেখিয়েছে, মার্কিন সামরিক শক্তি সবসময় প্রত্যাশিতভাবে কার্যকর নাও হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের অনুপস্থিতি প্রমাণ করেছে যে, মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট ব্যবস্থায় বিভাজনের লক্ষণ বাড়ছে।
চীনের লাভের হিসাব
চীনা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমিয়েছে এবং চীনের অবস্থান শক্তিশালী করেছে।
চীনা রাজনৈতিক ভাষ্যকার হু শিজিন বলেন, চীন কোনও দূরবর্তী মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে ‘বিজয়ের মুকুট’ পরতে চায় না। তবে এই সংঘাত বিশ্বে চীনের ভাবমূর্তি পরিবর্তনে ভূমিকা রেখেছে।
তার মতে, চীনের কৌশলগত পরিকল্পনা, জ্বালানি সংকট মোকাবিলা এবং শান্তিপূর্ণ উন্নয়নের মডেল অনেক দেশের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।
তিনি আরও দাবি করেন, এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করেছে, বিশেষ করে তাইওয়ান ইস্যুতে। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র মজুতের সীমাবদ্ধতা এবং মিত্রদের একত্র করতে ব্যর্থতা চীনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে।
চীন তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ দাবি করে এবং প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগের বিষয়টি উড়িয়ে দেয়নি।
চীনের ভারসাম্যের কূটনীতি
তবে বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র দুর্বল হয়েছে মানেই চীন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিশ্বের শীর্ষ শক্তি হয়ে যাবে- এমন নয়।
বেইজিং দীর্ঘদিন ধরে ‘বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা’র পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছে। ইরান যুদ্ধকে তারা যুক্তরাষ্ট্র-নির্ভর নিরাপত্তা কাঠামোর বিকল্প তৈরির সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।
তবে যুদ্ধ চলাকালে চীন সরাসরি কোনও পক্ষ নেয়নি। ইরানের দীর্ঘদিনের মিত্র হলেও তারা উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগ বজায় রেখেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ অনুযায়ী, চীনা কিছু প্রতিষ্ঠান ইরানের অস্ত্র সংগ্রহে সহায়তা করেছে। তবে বেইজিং এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, একই সময়ে ইরানের সবচেয়ে বড় তেল ক্রেতা থাকা এবং মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ বৈঠক আয়োজন করা চীনের কূটনৈতিক ভারসাম্যেরই উদাহরণ।
চীনের সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ সান চেংহাও বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র এখনও সবচেয়ে শক্তিশালী বহিরাগত শক্তি। তবে তাদের প্রভাব বজায় রাখতে এখন আগের চেয়ে বেশি রাজনৈতিক, সামরিক, অর্থনৈতিক ও ভাবমূর্তিগত মূল্য দিতে হচ্ছে।”
তার মতে, চীনের নীতিমালা- সার্বভৌমত্ব, অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং কূটনৈতিক সমাধানের ওপর গুরুত্ব- অনেক দেশের কাছে আকর্ষণীয় হতে পারে।
তবে চীনের বৈশ্বিক বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করবে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনার ওপর নয়; বরং তারা বাস্তব কূটনৈতিক সমাধান দিতে পারে কি না, জ্বালানি স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পারে কি না এবং উত্তেজনা কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে কি না- তার ওপর। সূত্র: সিএনএন








